রবিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১০

ময়নাতদন্তের ফাঁকি

এখানেই তো ছেলো গেলো কই? সন্দিহান চোখে সগিরের দিকে তাকায় দবির। দবির কাঁধ ঝুলিয়ে বলে তার আমি কি জানি, আমার দিকে এইরকম ভাবে তাকালে চোখ গেলে দিবো, এক সাথেই তো গেলাম এখান থেকে গত সন্ধ্যায়, তখনও তো ঠিকঠাক রেখে গেলাম, তা কি বৃত্তান্ত একটু খোলাসা করে বলো তো দেখি?
সগিরের মাথায় কোনো ব্যাখ্যা আসছে না এই মুহূর্তে, তার চেহারায় একটা অসহায় বোকাবোকা ভাব প্রকট হয়ে উঠে, অন্য সময় হলে দবির এটা নিয়ে ঠাট্টা করতো কিন্তু এখন তারও বিপন্ন অবস্থা, গতিক বুঝতে পারছে না, তার চোখে মুখেও বিভ্রান্ত ভাব।
মৌনতা ভেঙে সগির বলে, লাশের তো আর পাখা গাজাবে না যে উড়ে যাবে, স্বর্গের বাতাস খাইয়ে নিয়ে আসলাম সন্ধ্যে বেলায় আর এখন সুবহে সাদিক,
যুক্তিটা অকাট্য, লাশের তো পাখা গজাবে না, আর মুর্দামানুষ হেঁটে চলে বেড়াচ্ছে এটা পৃথবীর নিয়মে সংগত আচরন নয়, দবিরের ঝুলে পড়া চোয়াল আরও ঝুলে যায়, গত সন্ধ্যা থেকে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর স্মৃতিচারন করে সে।

সগিরকে নিয়ে উড়াল দিয়েছিলো সাঁঝের বেলায়, এর পর প্রথম আসমানে গিয়ে থামলো, সগির গেলো রহমতের সাথে কথা বলতে, রহমত প্রথম আসমানের দারোয়ান, বিশাল বপু, কিন্তু নিতান্তই সরল, মাঝে মাঝে চুকলি কাটে অবশ্য সগিরের কাছে, তাকে সরল পেয়ে সবাই ঠকিয়ে নিচ্ছে, এইভাবে পেয়াদা হয়ে এই ঝুরঝুরা গেটের বাইরে পাহারা দেওয়ার রসিকতায় তাকে কেনো ব্যাবহার করা হয় এইটা সে তার স্বল্প জ্ঞানে বোঝে না এমনও অনুযোগ করে। কথাট সত্যি, প্রথম আসমানের সীমানা প্রাচীরের অবস্থা খুব খারাপ। অনেক আগে দেওয়া প্রাচীরের অনেকটাই ধ্বসে পড়েছে, সেখান দিয়ে অনায়াসে চলে যাওয়া যায় ভেতরে, আর প্রহরি সংখ্যাও কমেছে, প্রথম আসমানের সংস্কার বাজেট নিয়ে অসন্তোষ লেগেই আছে প্রতি বছর, এ বছর সংস্কার কাজের জন্য যে বাজের বরাদ্দ তা দিয়ে প্রাচীরের কলি ফেরানোও সম্ভব না, দেয়াল নেই কিন্তু সেই অবয়ববিহীন দেয়ালের প্লাস্টারের জন্য টেন্ডার দেওয়া হয়েছে, উন্নয়ন বরাদ্দ এইটুকুই, প্রথম আসমানের ফেরেশতাকুল আকুল আবেদন জানিয়েছে অন্তত দেয়ালটা আরও একটু উঁচু করা হোক, পথ ভুলে রকেট এসে পড়ে, মাঝে মাঝে উলকা গ্রাহানুও ঢুকে পড়ে, কয় দিন আগে উলকার আঘাতে এক ফেরেশতার গুরুতর আহত হয়েছে, সীমানা প্রাচীরটা আরও 2 হাত উঁচু করলে অনেক অবৈধ্য অনুপ্রবেশ থামানো সম্ভব ফেরেশতাগনের মতামত এমনটাই।

দেিবর বয়েস স্বর্গের হিসেবে মাত্র 3 বছর,যেখানে একেক জন ফেরেশতা বাঁচে কয়েক হাজার বছর, এই বয়েস নিতান্ত শৈশব, এই শৈশবেই তাকে কাজের দায়িত্ব নিতে হয়েছে কারন নরকে গোলোযোগ, ওখানের অধিবাসিরা বিদ্্রোহ ঘোষনা করেছে, বহুদিন আগুনে থাকার পর আর তাদের আগুনের ভয় নেই, স্বর্গের নাতিশীতোষ্ণ পরিবেশে অনেক দিন কাটানো ফেরেশতাকুলে সমরকুশিলতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই কিন্তু নরকের দূর্দম তাপ সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়েছে তারা। আর এই খানে বহুদিন যুদ্ধবিদ্্রোহ হয় না, তাই পর্যাপ্ত সামরিক ট্রেনিং নেই সবার। নরকের অধিবাসিরা উদ্ভাবনকূশলি, তারা নতুন নতুন অস্ত্র তৈয়ার করিয়াছে, ফেরেশতা কুললের দেহ ঝলসে যায় এতে, তাদের আলোক তরঙ্গদৈর্ঘ বদলে ফেলার একটা যন্ত্র আবিস্কার করেছে নরকের অধিবাসিরা, এতে ফেরেশতাদের আলোকতরঙ্গ দৈর্ঘ কমিয়ে দূর্বল করে ফেলানো যায়। ইশ্বর বেশ অনেক ক্ষন এই যন্ত্রের পালটা যন্ত্র নির্মানের কৌশল আবিস্কারের জন্য চিন্তা ভাবনা করছেন, আসলে সেই যৌবনের তেজ এখন আর নেই তার, আগে যেমন মুখে বললেই সব হয়ে যেতো, দীর্ঘ সময় মানুষের কর্মকান্ড দেখে এখন তার সেই ক্ষমতাও লোপ পেয়েছে, মানুষকে দেখে রাখার হ্যাপা তাে চেয়ে ভালো আর কে জানে, 4000 বছর ধরে দেখভাল করছেন।
ইদানিং তারা আরও বেশি পারঙ্গম হয়ে গেছে, তার নিত্য নতুন যন্ত্র আবিস্কার করছে, মানুষ স্বভাবেই ধোঁকাবাজ এইটা তিনি বুঝেছিলেন আদমকে তৈরি করে মাত্র 3 /4 ঘন্টা দেখেই। মুখফোর এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখছে তাই এই নিয়ে কথা বাড়ালাম না, ঐদিন মুমিম নামের এক নেককার আদিম যুগের ফেরেশতা এসে জানালো একটা খবর- এক যন্ত্রে নাকি তার বানি বাজছে, এবং সেখানে ভীড় করে থাকা হাজার জনতা সেই বানী শুনছে, এ খানে বানী উচ্চারনের জন্য প্রাপ্ত পূন্য কোন খাতে দেওয়া হবে, এমন রিপোর্ট আরও এসেছে ধুরন্ধর মানুষ কথা আটকে রাখার যন্ত্র বানিয়ে ফেলেছে, এখন প্রতিটা বাসায় এসব কথা ধারন যন্ত্র আছে, তার বানী উচ্চারনের পূন্য এবং তার বানী শোনার পূন্য আলাদা খাতে রাখার বিঢান ছিলো, এই সব ঘটনার পর তিনি স্পষ্ট প্রজ্ঞাপন জারি করেছেন, এমন কোনো বিষয় দেখলে সেই ব্যাক্তির শুধু শোনার পূন্য হিসাবের খাতায় ডেবিট একাউন্টে লেখা হবে। আরও একদিন এক আডিম যুগের ফেরেশতা মাথায় ব্যান্ডেজ নিয়ে হাজির হলো, কোথায় নাকি সভচ্ছ আবরক রয়েছে, আনমনে প্রবেশ করতে গিয়ে গোত্তা খেয়ে পড়ে মাথায় আঘাত পেয়েছে, ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে তিনি যত নবিকে নিয়োগ দিয়েছিলেন তারা সবাই এমন সব অদ্ভুতুরে দূর্ঘটনার বীমা করছে পাগলের মতো, এবং অনেক অংকের জরিমানাও দিতে হচ্ছে আহত এসব ফেরেশতা কে। স্বর্গের নিয়মেই আছে, যদি কর্মরত অবস্থায় কেউ আহত হয় তার সর্বজীবনব্যাপি খরচাপাতি মেটানো ভার স্বর্গের। ফেরেশতাকুলের যাদের অবসরের বয়েস হয়েছে তাদের অনেকেই এখন উদ্ভট সব দূর্ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছে তাই তিনি নিয়ম করে দিয়েছেন সবার জন্য পৃথিবীতে কাজ খোঁজার দরকার নেই, এরা বরং স্বর্গের বাগান পাহাড়া দিক, ঝুঁকিমুক্ত সব কাজ করুক, তরুন তুর্কিদের দায়িত্ব দিয়েছেন পৃথিবীর মানুষের হ্যাপা সামলানোর, সেই পরিকল্পনা অনুসারে তিনি নতুন প্রজন্মের ফেরেশতাদের আইডিয়া হান্টের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন,
অবশ্য শেষ বয়েসে ফেরেশতাকুলের মধ্যে ধার্মিকতা বৃদ্ধি পায়, তারা শেষ বয়েসে দল বেধে আসে সপ্তম আসমানে, বায়তুল মামুরের চারপাশে একবার ঘুরে যায়, এখানের বিশাল মসজিদের বারান্দায় নামাজের ওয়াক্তে তিল ফেলানোর জায়গা অবশিষ্ঠ থাকে না, তিনি এই মসজিদের এলকা বৃদ্ধির জন্য টেন্ডার ডেকেছিলেন, কেউ অংশগ্রহন করে নি, অবশ্য একজন আবেদন করেছিলো, অতীত ইতিহাস ঘেটে তাকে বাতিল ঘোষনা করেছেন, সা'দের উপর তিনি প্রথম স্বর্গ তৈরি সময় থেকেই ক্ষিপ্ত।
এত বড় একটা সাম্রাজ্য মাঝে মাঝে একা লাগে তার, এত প্রনাম এত উপাসনা তার ক্লান্তিকর মনে হয়, বিনোদনের অভাবে ভুগছেন তিনি, নতুন কিছুই করার মতো নেই, সেই হুরপরিদের দেখে চেখে আর ফেরেশতাদের দেখভাল করে কাহাতক ভালো লাগে, এই বিদ্্রোহ তাকে বেশ অনুপ্রাণীত করেছে, অনেক দিন পর কিছু নতুন ঘটনা ঘটছে।
রহমতের সাথে কুশলবিনিময়রত সগিরকে রেখে দবির সামনে আগায়, দেখে ভেতরের বাগানে গোল গোল ছোটো ছোটো কি যেনো পড়ে আছে,
শৈশবের আমোদে সে সেই জিনিষের রহস্য উদ্ঘাটনে কার্ড পাঞ্চ না করেই ভেতরে ঢুকে যায়, গিয়েই আফসোস হয়, এটাতো রেকর্ডে থাকবে না, প্রতি দিন বের হওয়ার আগে একবার কার্ড পাঞ্চ করে সময় লিপিবদ্ধ করা হয় এবং ফেরত আসার পর আবার সময় লিপিবদ্ধ করা হয়, বোধ হয় সগির এত ক্ষনে কার্ড পাঞ্চ করে ফেলেছে, কেউ যদি রেকর্ড নিয়ে ঘটাঘাটি করে দেখবে সে সগিরের সাথে বের হলেও এক সাথে ফেরত আসে নি, সময়টা খারাপ, যে কেউ যেকোনো কিছু সন্দেহ করে ফেলতে পারে, নরকে গোলোযোগের পর থেকে কাউকে সন্দেহ হলেই নিয়ে গিয়ে জেরা করছে নিরাপত্তপ্রহরীরা।
পরে গিয়ে করলেও হবে, আপাতত দেখা যাক এই ছোটো ছোটো নুড়ির মতো জিনিষটা কি?

নুড়ির চিহ্ন ধরে ধরে সে যখন উৎসে পৌছালো দেখলো সেখান গমথভির মুখে আদম দাড়ানো, তার পোষা ছাগলটাকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়েছে।

তার সমস্ত উত্তেজনায় ঠান্ডা পানি ঢেলে দিলো কেউ এমন অনুভব হলো তার।
বিরক্ত ফিরে আসলো, কার্ড পাঞ্চ করে পানশালায় গেলো, সরগরম পানশালা, যুদ্ধফেরত সৈনিকদের বিয়ারের গেলাস হাতে রসিকতা করতে দেখা যাচ্ছে, তারা এখন স্বর্গের জাতীয় বীর, আহত সৈনিকদের বেশির ভাগের শরীর দূর্বল, তবু তাদের মুখে তুবড়ি ছুটছে, সেসব বড়াই করা কথাবার্তা দবিরের পছন্দ না।
পরীবানুর মেয়ের সাথে দেখা করতে হবে, গত সন্ধ্যায় চিঠি দিয়েছিলো, প্রথম ডেট আজকে, কি বেশবাস নিবে বুঝছে না, অবশ্য তার ফিচকে বন্ধুরা বলেছে, পরিবানুর মেয়ে মাল খাসা, আর পুরুষের বেশবাস কি যন্ত্র ঠিক থাকলেই হলো, ঐটাই আসল পাসপোর্ট হৃদয়ে প্রবেশ করার।
যন্ত্রের কার্যক্ষমতার পরীক্ষা করে দেখেছে সব ঠিক ঠাক আছে,
এরপর রাতটা কাটিয়ে পরিবানুর মেয়ের সাথে সেই রাতদুপুরে উঠে ছুটতে হয়েছে কাজে, আর এই এখানে এসে এই দূর্ভোগ, লাশ হাপিশ কবর থেকে?

নিউ কাটিং এজ টেকনোলগির সাথে নিজেদের ট্রাকিং ব্যাবস্থার উন্নতি করতে হবে এমন শত শত প্রস্তাব আটকে আছে বুরোক্রেসির ফাইলে, আর সব বিজ্ঞানিদের ধরে ধরে নরকে পাঠানোর ফলে টেকনোলজির যেই সুবিধাটা পাওয়ার কথা ছিলো স্বর্গ উদ্ভাবনি ক্ষমতায় অনেক পিছিয়ে এই কারনে,

আরে বাবা প্রতিটা লাশের সাথে একটা জিপিএস ট্রাকিংয়ের ট্যাগ লাগালেই ল্যাঠা চুকে যায়, হাতে ম্যাশিন নিয়ে টুকটুক করে চলে যেতে পারতো তারা, কিন্তু ইশ্বরের অভিপ্রায় বলা মুশকিল, তিনি সব কাজ ময়ানুয়াল লেবারে করাতে চান, সবাই কি আর গোয়েন্দাপুলিশের কুকুর, গন্ধু শুঁকে শুঁকে লাশের খবর গন্তব্য বের করে ফেলবে, আর মানুষজন এখন যেসব উগ্র গন্ধের সুগন্ধি ব্যাবহার করে তাতে বোঝাও মুশকিল কোথাকার গন্ধ কোথায় নিয়ে যায়, আর সম্ভব নয়, আমি পদত্যাগ করবো ভাবে সগির, দবির গোয়েন্দার মতো আশপাশ দেখে, এর পর খেয়াল করে কবরের উপরে কোনো আবরন নেই। কিন্তু লাশের এত ক্ষমতা হয় নি যে কবর খুঁড়ে ফুঁড়ে বেরিয়ে যাবে, নিশ্চিত কোনো 3য় পক্ষ এখানে কাজ করছে, এই নিয়ে একটা রগরগে রিপোর্ট পাঠাতে হবে, তাহলে যদি পদোন্নতি হয় তার,
সগিরের হতাশ চেহারা আর দবিরের অসহায় মাথা চুলকানোর দৃশ্যেই শেষ হতে পারতো, কিন্তু আসল ঘটনা ফাঁস না করে পারছি না,
ময়না তদন্তের জন্য লাশটাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া
হয় গত রাতে।

প্রকাশ করা হয়েছে: আমার ডায়েরি  বিভাগে । সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০


  • ৩ টি মন্তব্য
  • ৩১১ বার পঠিত,
Send to your 
friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ০ জনের ভাল লেগেছে, ০ জনের ভাল লাগেনি
১. ২৭ শে মে, ২০০৬ সকাল ৭:০৫
অতিথি বলেছেন: একজন পাঠক হিসাবে আমার অনুভূতি - সগির দবির শুরুতে কিছুটা বিভ্রান্ত করেছে। কে কাকে বলছে বোঝা যাচ্ছিল না। - একটা কিছুর অভাব আছে এ লেখাটাতে - মসৃন নয়, ঘটনা ও বাক্যের বিন্যাসে।

মাফ করবেন। আপনার সব লেখা পড়ি এ জন্যই বললাম।
২. ২৭ শে মে, ২০০৬ বিকাল ৪:০৫
অতিথি বলেছেন: এখনও সংলাপ লেখা শিখতেছি, দক্ষ হয়ে গেলে এই সমস্যা থাকবে না, নাটকের মতো চরিত্র ঃ দিয়ে সংলাপ লেখাটা আমার পছন্দ না, এই জন্য আলাপনের মতো সংলাপ লেখার চেষ্টা, মাঝে মাঝে ভুল হয়, ওটাই স্বাভাবিক, মানুষ ভুল করতে করতে শিখে।
৩. ২৭ শে মে, ২০০৬ সন্ধ্যা ৭:০৫
উৎস বলেছেন: একটু জটিল, তবে রাসেলের কোন লেখাই বাদ দেই না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন