ভারতে আসার পর থেকে হোটেলে হোটেলে এই রুম সংক্রান্ত জটিলতার অবসান হওয়ার কোনো সমভবনা দেখা যাচ্ছে না, এখন যেই হোটেলে এসেছি, সেটার ভাড়া কাগজে কলমে এক বেড 19 ডলার,, 2 বেড 33 ডলার, 3 বেড 45 ডলার, ভারতের টাকায় 500, 1000, 1500 রুপি, যদিও এই ভরা শীতে এত দাম দিয়ে কেউ আসবে না এখানে, হোটেলটা 3 তলা কিংবা 4 তলা, আমাদের এমনিতে রুম দরকার হয় 12 থেকে 14টা, কোলকাতায় 2টা 6 বেডের রুম পাওয়ার 10 বেডেই হয়ে গিয়েছিলো, সব খানে তো আর 6 বেডের রুম পাওয়া যায় না, এখানে উপরের তলায় 5টা রুম পাওয়া গেছে, স্যারেরা নির্দেশ দিয়েছেন সব মেয়েদের থাকতে হবে তাদের রুমের আশে পাশে, আমাদের মেয়েদের জন্য যে কয়টা রুম লাগে সব গুলো স্যারদের পাশে ফেলানো সম্ভব হয় নি, বিভিন্ন তলায় রুম বরাদ্দ করার পর দেখা গেলো একটা রুমে একেবারে নীচের তলায়, বেসমেন্টে , ওখানে কে যাবে এই নিয়ে বিতর্ক চলছে, হলবাসী ভাইয়েরা এতক্ষন ঝামেলা করেছে তাদের একই ফ্লোরে রুম দিতে হবে, ভয়ংকর একটা দাবি, তাদের চাহিদা মতো রুম দিতে গেলে হোটেলের অন্যান্য অতিথিদের রিশাফল করতে হবে এটা বুঝতে পারার পর তারা মানলো যে বিভিন্ন ফ্লোরে থাকলেও আসলে কোনো সমস্যা নেই।
হোটেলের প্যাসেজ সংকীর্ন বড়জোড় 4 ফুট চওরা হবে, এর 2 পাশেই রুম, তবে 2 বিছানার রুমের সংখ্যা বেশী, এত বিলাসিতা আমাদের পোষায় না বলেই সমস্যা বেধেছে, আমাদের সামনের রুমে উঠেছে রহিমা, উর্মি,সবাই নিজেদের রুমে ব্যাগ রেখে এসেছে, তবে সেই একটা নীচ তলার রুমে কে যাবে এই নিয়ে কোনো মীমাংসা হয় নি। লিটু ভাই যখন বললো তিনিই ঐ রুমে যাবেনা তখন আমরা সবাই লজ্জিত, আপনি কেনো যাবেন, আমরা কেউ একজন যাবো, আপনি উপরে একটা রুম ঠিক করেন, কোনো সমস্যা নাই।
নীচের রূমের প্রধান সমস্যা ওটা স্যাঁত স্যাঁতে, ঠান্ডাও বেশি, আর এই শালার হোটেল মালিকরা কোনো রুম হিটিংএর ব্যাবস্থা রাখে নি, ওটা নিজের পয়সায় নিতে হবে ভাড়া। বিকালে এক কেলেংকারি হয়ে গেছে, এ যাবত কালের সবচেয়ে বড় কেলেংকারী। রাজ্যগুলোর নিজস্ব সীমানা আছে, যেখানে চেকপোষ্টও আছে, এমন একটা চেকপোষ্টে আমাদের জীপ থামানো হলো, পেছনের বাস তখন অনেক অনেক দুরে, বাস থেকে সবাই হাসিমুখে নামলাম, চৌহান আছে, ও আলাপ করলো পুলিশের সাথে, পুলিশ 11 জন উঠতি যুবককে দেখে জীপ সার্চ করতে চাইলো, অবশ্য না চাওয়ার কোনো কারন দেখি না, আমরা কেউই এখানে আসার পর শেভ করি নি, সবার গালেই খোঁচা খোঁচা দাড়ি, আর রাতে ঘুম কম হওয়ায় সবার চোখের নীচেই কালি পড়েছে। আমরা জীপ থেকে সরে গেলাম, জীপ থেকে একের পর এক মদের বোতল সাজানো হচ্ছে রাস্তায়। প্রায় 10টার মতো মদের বোতল রাস্তায়, এখানে এক অদ্ভুত নিয়ম আছে, এক রাজ্যের মদ অন্য রাজ্যে বিক্রি করা নিষিদ্ধ, এই এক আইনের গ্যাঁড়াকলে পড়লাম, মানালিতে আয়েশ করে খাবো বলে মদ সংগ্রহ করা হয়েছিলো, সেসবের মুখও খোলা হয় নি, সেসব দেখে শ্রদ্ধেয় পুলিশ সাহেব ঘোষনা দিলেন 1700 রুপি জরিমানা অথবা জেল হাজত, থানা পুলিশ, ক্যানো আমাদের উপর এই অত্যাচার, বললো মুখ বন্ধ অবস্থায় বোতল নিয়ে গেলেই এই কেস খাইতে হবে, তাকে যতই যুক্তিতে বোঝানোর চেষ্টা করি আমরা ছাত্র মানুষ, ভিন দেশি আমাদের নিজস্ব ব্যাবহারের জন্যই আমরা এসব নিয়ে যাচ্ছি, এসব নিয়ে বানিজ্যের কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই, তাছাড়া কয়েকবোতল বীয়ার আর মদ নিশ্চই কেউ বানিজ্যিক ভিত্তিতে নিয়ে যাবে না। তবে পুলিশের উপমহাদেশীয় চরিত্র সবখানেই একই রকম, এখানে টাকার গন্ধ পাওয়া গেছে, তার কথা হলো মদের ঢাকনা যদি খোলা থাকতো তাহলে এটা কোনো সমস্যা ছিলো না, মর্তুজা গিয়ে বললো ঠিক আছে ভাই আপনি বোতল খুলে কয়েক চুমুক দিয়ে এসবের সতীত্বহানী করে এসবকে ভিন্ন রাজ্যে ব্যাবহার উপযোগী করে দেন। বেচারা এই কাজ করতে নারাজ, অবশেষে আমরা সবগুলোর ছিপি খুললাম, তবে জরিমানার টাকা কমলো না, অনেক দরকষাকষি চলছে, অবশেষে সাহেবের দয়ার শরীরে আঘাত লাগলো, তিনি 1200 রুপি জরিমানা নিয়ে আমাদের খালাস করবেন বললেন। লিটু ভাই আগুন হয়েছে ক্ষেপে সবাই পকেট আঁচড়ে যা হাতে উঠলো সব দিয়ে 1200 টাকা পুরিয়ে পুলিশ বাবাজীকে দেওয়া হলো। এবং আমরা জীপে ঢোকার আগেই বাস হাজির সেখানে, অবশ্য হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছি সবাই, যদি অন্য 2 সিনিয়ার স্যার এই দৃশ্য দেখতো যে আমরা 9 পাপী বান্দা এবং লিটু ভাই এক সারি মদের বোতলের সামনে পোজ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি তাহলে পরবর্তি শিক্ষকসভায় লিটুভাইকে ভেজে ফেলতো ওরা।
লিটু ভাই এর পর মিয়ারা এইটা দেখবা না, এই খানে লিখা আছে, অবশেষে সবাই মদের বোতলের ছোটো ছোটো লেখাগুলো পড়লো, সেখানে লেখা আছে এটা যে রাজ্যে তৈরি হয়েছে শুধু সেই রাজ্যেই বিক্রয়যোগ্য, অন্য কোনো রাজ্যে এটাকে বিক্রয় করা ইন্ডিয়ান পেনাল কোডের মতে অপরাধ, জরিমানা এত- এসব ইনফরমেশন কে জানতো, ঠেকায় না পড়লে হয়তো আমরাও খেয়াল করতাম না, বোতলের পর্সেন্টেজ আর নাম এর বাইরে কেউ মদের বোতলের অন্য কিছ ু পড়ে বলে মনে হয় না।
সেই মদ্যপান হবে, লিটু ভাইকে নীচের স্যাঁত স্যাঁতে রুম ছেড়ে দিতে গিয়ে আবার সবার ভেতরে একই সন্দেহ, লিটু ভাই বিকালের ঘটনায় মাইন্ড খাইলো কিনা কে জানে। লিটু ভাইয়ের রুমের সামনে ছোটো একটা ব্যালকনির মতো, সেখানে সোফা রাখা আছে 3টা। ওখানে বসে আড্ডা দেওয়া হবে ভালো ভাবে, বাবুর্চি রান্না করছে ,সেই একই মেনু, এবং রান্নাও জঘন্য, তবে খেতে হবেই, কোনো অগ্যতা নেই। খাওয়ার ডাক এসেছে, লিটু ভাই গোসল করতে গেলো, আমরা উপর যে যার রুমে গেলাম, অভিযোগের পরিমান নগন্য এখানে, মানে অন্য সব হোটেলের মতো সবাই একই অভিযোগ নিয়ে আসছে না, জানালার কাঁচ ভাঙা, বিছানার চাদর বদলানো হয় নি, এসব অভিযোগ শুনলে মেজাজ আরও খঁচে যায়। একজন আসলো তার রুমের গরম পানি কাজ করছে না, অতএব আরেকজনের রুম তাদের দেওয়া হলো। সেই রুমের মানুষেরা আবার অন্য এক রুমের হিজরত করলো। সেখানে গীজার ছাড়া হয়েছিলো তবে মানুষের বড় তাড়াহুড়া, তারা সামন্য অপেক্ষা করলেইংরম পানি পেতে পারতো।
আমার সেই 2 ফুট বাই 2 ফুট তোয়ালে দিয়ে ভালোই গোসল হচ্ছে, তবে গোসলের পর পর দাঁতে দাঁতে ঠকঠক বিষয়টা খুবই ভয়ংকর অনুভব, আমি ঘোষনা দিলাম এই চোটে আমার সব দাঁত খসে পড়বে কার্টুনের মতো, তা খসে নি, আমরা সবাই দল বেঁধে নিচে গেলাম, খাওয়ার রুমে, হোটেলর লোকেরা দয়া করে থালা গ্লাস সরবরাহ করেছে, সেই থালায় গরম ভাত, একটু শব্জি, সালাদ, মুরগি দিয়ে আহার সারো, সঙ্গে একমাত্র সঞ্জয় সাহা ভিন্ন কোনো হিন্দু নেই, তবে তার সম্মানে সবার গরু খাওয়া বন্ধ, অবশ্য ভালোই হয়েছে, এই বাবুর্চির যেমন রান্না ওটা খাওয়ার কোনো মানে হয় না। খাওয়ার পর লাইন বেঁধে থালা ধোও, এবং শুচিবাই সম্পন্ন আরও মানুষ আছে তারা তখনও থালা ধোয়া শেষ করতে পারে নি, বারবার ধুয়ে কি করতে চাইছে আমি জানি না।
খাওয়ার পর আমরা সেই কনফারেন্স রুমে গেলাম, তানভীর আজকে উদার, সে মদের বোতল খুলে বসে আছে, সবাই ভেতরে ঢুকছে সে এক পেগ করে ঢেলে দিচ্ছে, লিটু ভাই, আশফাক রুমমেট বলে আগেই কাজ সেরেছে, এর পর যারাই আসছে তারাই একবার করে ঢু মেরে আসছে তানভীরের মদ। ফ্রি, তবে মদপায়ি মানুষের সংখ্যা কম, রুবেল তমাল ছুবে না, মর্তুজাও ছুবে নাম, মর্তুজার বীয়ারে আপত্তি নাই, হার্ড লিকারের ভক্ত লুকু, সেও একচোট খেয়ে ফিরে আসলো। সিগারেট চলছে , একটা প্যাকেটকে এ্যশট্রে বানিয়ে ভালোই জমিয়ে তোলা হয়েছে আড্ডা। এসময় যুঁথি আসলো উপর থেকে ওদের রুম সিঁড়ির ঠিক পাশে, সিঁড়ির সামনেই আমরা বসেছি, তবে ওর রুম আমাদের ঠির 2 তলা উপরে। যুঁথি আসার পর ওকে পাঠানো হলো রুমের ভেতরে, ও এডভেঞ্চারাস মেয়ে, তাই ওকে যখন বলা হলো ভেতরে প্রসাদ বিতরিত হচ্ছে, আমরা সবাই একবার করে প্রসাদ খেয়ে এসেছি, যুঁথি ভেতরে ঢুকলো, এবং ছিটকে বের হলো, এবং দৌড় দিলো সিঁড়ি দিয়ে, প্রথম সিঁড়ির শেষ মাথায় হোঁচট খেলো, ভয়ংকর হোঁচট, এবং খোঁড়াতে খোঁড়াতে উপরে উঠলো।
পেছনে হাসির তুফান, আমরাও হাসছিলাম তবে পড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে আমরা চুপ। তানভীর কি বলেছিলো যুঁথিকে? বিশেষ কিছু না, যুঁথি ঢোকার পর ও হাতে একটা গ্লাস তুলে বলেছিলো, যুঁথি মাল খাবা? মাল? অবশ্য তানভীরের ভাষ্যে মাল নিছকই মদ, অন্য কিছু না, যেমন টা আমরা আড্ডা ব্যাবহার করি সে অর্থে যে ব্যাবহার করে নি। যুঁথি কি আঁতকে উঠেছিলো, বিভিন্ন রকম অনুমান চলছে সোফায়। শামিক কিছুক্ষন পর বললো দোস্ত ঘটনাটা ঠিক হইলো না, চলো যুঁথিকে সরি বলে আসি। আমি কি করার একটা সিগারেট জ্বালিয়ে চললাম যুঁথিকে সরি বলতে। আইভি, স্বর্না যুঁথি এক রুমে, যুঁথি গিয়েই দরজা বন্ধ করে দিয়েছে, আমরা বন্ধ দরজার এপাশে অনুনয় করছি খোলো খোলো দ্্বার রাখিও না আর বাহিরে মোদের দাঁড়ায়ে, স্বর্ণা দরজা খুলে একচোট ঝাড়ি নিলো। আমরা সাধুবাবার মতো মুখ করে বললাম য ঘটেছে ওটার সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই, আমরা শিশুর মতো নিষ্পাপ। তবে যুঁথি বের হওয়ার নাম নেই, অবশেষে মহাত্বনের দয়া হলো, তিনি বললেন আমি ঠিক আছি তোমরা যাও। বাইরে দাঁড়িয়ে নাটক করিও না।
আমরা বললাম পা ঠিক আছে তো?
আমি বললামই তো আমি ঠিক আছি, আর পাকনামি করতে হবে না যাও নীচে যাও, হা হা হি হি করো।
অবস্থা সুবিধার না, আমি নিজে কেনো এখানে দাঁড়িয়ে আছি বুঝতেছি না, আমার এইসব কথা বার্তা হজম হয়, এর মধ্যে শমিক বলে বসলো তুমি বাইরে না আসা পর্যন্ত আমরা দরজা থেকে নড়বো না, তুমি দরজা খুলে বলে তুমি ঠিক আছো, তাহলে আমরা এখান থেকে চলে যাবো।
যুঁথি অবশেষে দরজা খুলে বের হলো, বেচারার পা মচকে গেছে, একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাটছে। শমিক পা ধারয় ওস্তাদ, তবে সে পীড়াপীড়ি করে যুঁথিকে নিচে নামতে রাজী করালো, যুঁথি খোঁড়াতে খোঁড়াতে নীচে আসলো। আমাদের সাথে গোটা 2 সিগারেট টেনে বেচারা চলে গেলো।
একটা পর্যায়ে লিটু ভাই বললো ঘুমের সময় হয়েছে, তোমরা এখানে আড্ডা দিতে পারো আমি গেলাম ঘুমাইতে। তানভীরের কয়েকটা পোট্রেট তুলে লিটু ভাইবিহীন আড্ড া এখানে টানার কোনো মানে হয় না এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা যে যার ঘরে ফিরে গেলাম। যাওয়ার পথে দেখি রহিমা দরজার বাইরে, আররে রহিমা সুন্দরি এইটু এই ঘরে আসো।
ক্যানো?
আরে বাবা আসোই না, এই হোটেল ভর্ত মানুষের মাঝখানে তো তোমাকে কিছু করবো না ভয়ের কি আছে?
রহিমা ঘরে ঢুকলো, এইবার আসলাম বলো কি বলবা?
একটু হাসি দিয়া যাও, এর পর থেকে ডাকলে একটা কইরা হাসি দিয়া যাইবা।
রহিমা হাসি দিয়ে বললো, এইবার ঠিক আছে?
আমি আর শমিক বুকে হাত দিয়ে উলটে পড়ে বললাম হ 100% ঠিক।
কেউ নাই ঘরে, পাশের ঘরেও কেউ নাই। কই গেলো জনগন? অবেশেষে অন্য এক রুমে দেখা পাওয়া গেলো ওদের, বাবু মুখ হাঁ করে ঘুমাচ্ছে, জামাল জসিম কাইত হয়ে পড়ে আছে। হালকা আড্ডা হচ্ছিলো, তবে পরদিন রোটাংপাস যাওয়া হবে সকাল সকাল তাই সবাই আসলে বিছানায় যাবে।
পরদিন সকালে যা ঘটলো ওটার জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না, তমাল যাবে না ও অসুস্থ বোধ করছে, এছাড়া আইভিও অসুস্থ, ওকেও দেখতে হবে, শিক্ষকেরা যাবে না কেউ, তারাও এই 21 ঘন্টার ভ্রমের ধাককা সামলাতে পারছে না, স্বর্ণা যাবে না, রুবেল যাবে না। অতএব এইসব প্যানপ্যানাইন্যা মানুষকে পিছনে রেখে যার যার ইচ্ছা তারা রোটাংপাস যাবে এই ঘোষনা হলো। সবাই সেই মতো নীচে নামলো। সিরাজ এসে বলে তোমরা এইখানে আসার পর সব মজা লুটতেছো। তামরা জীপ নিয়া ঘুরাঘুরি করো, আমাদের একবারও বললা না? তোমাদের কথামতো সব চলবে না কি?
মেজাজ আগুন হয়ে তিড়িং বিড়িং করছে, অথচ কি বলবো বুঝতে পারতেছি না । অধিক রাগে বাক্যহীন অবস্থা। আশফাক মুখ খুললো, দোস্ত দেখো এই জীপটাতো কারো বাপের সম্পত্তি না, তোমরা যাইতে চাইলে যাবা, কেউ তো বাঁধা দেয় নাই তোমাদের, যখন দিল্লিতে জীপটা নেওয়া হয়েছিলো তখন কেউ চড়তে রাজী ছিলা না। কাউকে না কাউকে সউাক্রিফাইস করতে হতো, সেই কাজটা আমরাই করছি, এর আগে ট্রেনের বগি ছেড়ে আমরা অন্য বগিতে গেলাম, এবারও ঠিক একই কাজ করেছি।
লুকু আসলো, ও বললো কোনো ঝামেলায় যাওয়ার দরকার নাই, তমালের সাথে প্রথম দিন কথা হইছে, ও বলছে ওরা চাইতাছে টু্যরটা ভন্ডুল হয়ে যাক, আমরা এরেঞ্জ করছি ঐটা ওরা সফল হইতে দিবে না। ওদের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাবি না। নিজেরা মানায়া চল তবে কোনো ঝামেলা করিস না। তোরা বাসায় থাকিস, আমাকে রুবেলকে মর্তুজাকে হলে থাকতে হবে। তোরা তখন কি করতে পারবি বল।
সুতরাং আমরা সুবোধ বালক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম, বললাম গো এহেড ভাইয়েরা, তোমরা জীপে উঠে পড়ো আমাদের কোনো আপত্তি নাই এ বিষয়ে। আমরা ব্যাগ নামিয়ে বাসে রাখলাম, সিরাজ, মানিক, পলাশ, চন্দন, দুলাল, সঞ্জয়, টিপু একে একে উঠে পড়লো জীপে সেখানে লিটু ভাই যাবে। শিক্ষক যাবে না তবে তার ইটালিয়ান বৌ যাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাকে সহ আমরা বাসে উঠলাম। অনেক অনেক দিন পর সবাই চলতি পথে আড্ডা দিবো, এই দিনটাতেই রুবলে তমাল আইভি স্বর্না নাই, কি আর করার। আমরা বাসের জানালা দিয়ে বিস্ফোরিত চোখে প্রকৃতি দেখি।
বাসঘুরে আমরাও মাথা ঘুরাই, সিগারাট টানি ঘন ঘন, সীটের উপরের হাতলে বসে আছি, সীটের উপর পা দিয়ে, ড্যাম কেয়ার একটা ভাব সব সময় চোখে মুখে, পথে একটা জায়গায় সবাই থামিয়ে বরফউপযোগী ড্রেস ভাড়া নিলো, বোটকা, ভয়ংকর গন্ধ, আমি নিতে রাজি না, এই জিনিষ গায়ে চাপালে গন্ধে মারা যাবো, শীতে মারা যাওয়া গন্ধে মারা যাওয়ার চেয়ে ভালো সমাধান। সবাই না নিলেও কেউ কেউ ভাড়া নিলো সেই ড্রেস। এর পর বাস কিছুটা সামনে এসে থামলো। এর পরের রাস্তায় বরফ জমেছে, ওখানে বাস চালানো যাবে না। তাই আমাদের এখান থেকেই ফিরে যেতে হবে। আমরা মারমুখি হয়ে যাই, রোটাং পাসের বরফ হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করবো বলেই না এত দুর ছুটে আসা, আবহাওয়াও তেমন ভয়ংকর না, তাহলে কেনো আমাদের বঞ্চিত হতে হবে বরফশীর্ষ দেখা থেকে।
এসব সময়ে কারো উন্মাদনা ভালো কাজ করে, লুকু যখন প্রথ ম জনপ্রতি 100টাকা হারে জীপ ভাড়া করে ফেললো তখন সবাই একসাথে সিদ্ধান্ত নিলো সবাই যাবে ওখানে আর জীপে করেই যাবে। এক জীপে আঁটবে 12 জন, বাস আছে 35 জন, তাই তারা 3 জীপেই এঁটে গেলো। জিপ রওনা দিলো পাহাড়ি পথে, রোমহর্ষক সে ভ্রমন, রাস্তা 15 ফুটের মতো চওড়া, এর মধ্যে 60 কিমি বেগে জিপ চলছে, রাস্তার এক পাশে পাহাড়ের দেয়াল, অন্য পাশে গভীর খাদ, যাট কোনো তলা দেখা যাচ্ছে না, প্রায় 100 ফিট চওড়া নদীটাকে ঝকঝকে রুপালী ফিতার মতো দেখা যাচ্ছে, অবশ্য একজন বললো বলেই ওটাকে নদী ঘোষনা দিলাম, নীচে পাহাড়ী গাছ, ঝোপঝাড়, সবই দেখা যাচ্ছে তবে সবাগুলো আকার মিনিয়েচার। পাশাপাশি 2টা জিপ চললে মাঝে কয়েক ইঞ্চির ব্যাবধান থাকে, এর মধ্যে 60 কিমি বেগে চালানো, পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হাওয়ার ঝাপটা লাগে গায়ে। আমার পাশে শ্রদ্ধেয় ইটালিয়ান ম্যাডাম, মাসুম তার সাথে খাজুইর্যা প্যাঁচাল দিচ্ছে, আচ্ছা আপনাদের ভাষায় আই লাভ ইউ কিভাবে বলে। জীপের ছোটো পরিসরে গায়ে ঘষা লাগছে, আমি অন্য পাশে তাকিয়ে সিগারেট ধরাই, অনুমতির তোয়াককা না করেই, অভ্যবত্যার কোনো প্রশ্ন নেই, সমস্ত বাসে সিগারেট টানতে টানতে আসলাম এখন পাশে বসে যদি অনুমতি প্রার্থনা করি সেটা খেলো শোনায়।
তখনই দেখলাম সেই পাথরটাকে, প্রায় 1500 মিটার লম্বা একটা পাথর, একটাই পাথর সটান খাড়া, ওটার আশে পাশে কিছু নাই, কুতুব মিনারের মতো বিশাল একটা পাথর, ওটার অনেক নীচে লাল পাথর দেখা যাচ্ছে। এই পাথরের জন্ম আগ্নেয় গিরির লাভা থেকে। পাললিক পাহাড় যেমন আমাদের দেশে দেখা যায় তেমন না, এটা গ্রানাইটের চুঁড়া, এবং লোহার পরিমান বেশী বলেই লাল, এছাড়া অন্যসব গ্রানাইটের কালো হওয়ার কথা। যদিও এ বিষয়ে ঘোষনা দেওয়াও ঠিক না, তবে কালো গ্রানাইট শব্দটা বইয়ে পড়েছি বলেই মনে স্থির ধারনা গ্রানাইট হলেই কালো হতে হবে।
ঐ একটা পাথর দেখলে ভেতরটা ভয়ে শীতল হয়ে যাচ্ছে, ঠান্ডা একটা স্রোত নামছে মেরুদন্ড বেয়ে। যেভাবে গতির প্রতিযোগিতায় মেতেছে এরা তাতে একবার পথহারা হলে সোজা নীচে 1500 মিটার নীচে গিয়ে পড়তে হবে। এমন একটা বাঁকের সামনে দেখি ইটালিয়ান ম্যাডাম আমার হাত আঁকড়ে ধরে বসে আছে শক্ত হয়ে। আমি আশ্বাসের হাসি দেই তাকে। বললাম ইটালিতে তো আল্পস আছে, ওখানের রাস্তা এরকম না?
ওখানেও কি পাহাড়ের চুঁড়ায় বরফ আছে।
ইটালিতে থাকলেই সবাই আল্পসে চড়ে না। আসলেই কথা সত্য বাংলাদেশের কক্সবাজারে কতজন গেছে, বাংলাদেশের 85% মানুষ জীবনে কোনোদিন কক্সবাজার যায় নি। এমন কি একটা জরিপে পড়েছিলাম পৃথিবীর 70% মানুষ তার জন্মস্থান থেকে 150 মাইল পরিধির বাইরে যায় না জীবনেও। সবাই সেই 150 মাইল বৃত্তের ভেতরে বাস করে, আমরা সেই 30% মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছি, যারা বাইরে যাচ্ছে, বাংলাদেশের অনেকেই ঢাকায় আসে নি, এটাও কারো কারো কাছে সেই 150 মাইলের সীমানার বাইরের দেশ।
অবশেষে জীপ থামলো এক জায়গায়, লিটু ভাইদের কোনো পাত্তা পাওয়া যাচ্ছে না, যেখানে বাস থেমেছে তার সামান্য কিছুদুর পরেই একটা মাইল ফলক, ওটার থেকে একটু দুরে চীনের সীমান্ত।আর চীনের সাথে ভারতে সীমান্ত বিষয়ক জটিলতা আছে তাই ও জায়গাটা মিলিটারি পার্সোনালদের জন্য সংরক্ষিত। তবে অন্য পাশে যা আছে ওটার তুলনা ওটা নিজেই, 30 গজ সামনে আগালেই বরফ, সাদা বরফ, আর ঐ বরফ ধীরেধীরে উঁচু হয়ে একটা চুড়া তৈরি করেছে, আমরা একটা শৃঙ্গের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
অনেক মানুষ, সবাই কয়েক পরত কাপড় পড়ে আছে, কেউ কেউ স্কিবোর্ড নিয়ে এসেছে, তারা ওটা পায়ে লাগিয়ে নামার চেষ্টা করছে, বরফে ধুপুস করে পড়ছে, এবং খিলখিল করে হাসতে হাসতে উঠছে।
আমার পায়ে চটি, পড়নে একটা শার্ট আর 150 টাকার জ্যাকেট। আমিও পায়ে পায়ে বরফের দিকে হাঁটি। বরফে উঠে পড়ি একটা সময়, বরফে পা ঢুকিয়ে হাঁটার আনন্দ অন্য রকম, এখানে হিউমিডিটির পরিমান আরও কম। সুর্যের আঁচ গায়ে বিধছে, আমি জ্যাকেট খুলে শুধ ু শার্ট পরে হাঁটি বরফের উপরে। অবশ্য এটাই সমস্যা, বরফের সামনে আসার পর প্রথম 15-20 মিনিট কোনো ঠান্ডা অনুভব হয় না। এর পর ধীরে ধীরে ঠান্ডা লাগতে থাকে। কিছুদুর হাঁটার পর দেখলাম পায়ের নফ ব্যাথা করতেছে। ফ্রস্ট বাইট বলে একটা বিষয়ও আছে, এখানে বরফের ভেতর ফ্রস্ট বাইট হলে শেষে আঙ্গুল কেটে বাদ দিতে হবে, এতটা ঝুঁকি নেওয়া যায় না। আমি আড়াআড়ি হেঁটে দ্্রুত বরফ পার হই, সামনে পাইলাম তানভীরকে,
কি রে কই যাস তুই,
একটু পেসাপ করবো,
চল আমিও ঐ কাজ করুম। অতএব আমরা পাহাড়ের উপরে দাড়িয়ে মুতলাম, এটার জন্য খানিকটা পথ হাঁটতে হলো, এর পর গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে জীপের পাশে বসলাম, সেখানে ইটালিয়ান ম্যাডাম বসে আছে, জিজ্ঞাসা করলাম সমস্যা কি, বরফে না গিয়ে এখানে বসে থাকার মানে কি।
বললো গ্লাভস নাই, আমি বললাম কোনো সমস্যা নাই, আমার কাছে একজোড়া আছে, আমি ব্যাবহার করছি না, তুমি নিতে পারো। বেচারার আঙ্গুলের নখ নীল হয়ে গেছে। বেচারার সাথে এককাপ কফি নিয়ে বসলাম, আমরা সবাই বরফে যাবো বেচারা রাস্তার উপরে একা একা বসে থাকবে বিষয়টা দৃষ্টিকটু লাগে। সেই গরম কফির কাপ ধরে বেচারা আংগুলে উষ্ণতার পরশ লাগাচ্ছে, আমার মন পড়ে আছে সেই পাহাড়ের চুঁড়ায়। তানভীর পাহাড়ে যাবে না, ও একটা ভীতুর ডিম, ওর ভিতরে এডভেঞ্চার এ টাও নাই। আমি অনুরোধ করে হাতের গ্লাভসটা তাকে দিলাম। এর পর আবার হাঁটা শুরু করলাম বরফের উপর দিয়ে।
কিছুদুর হাঁটার পর আর পারি না, ঘনঘন শ্বাস নিচ্ছি, পাহাড়ের উপরে বাতাসের চাপ কম, বাতাসের ঘনত্ব কম, এটাই বোধ হয় স্বাভাবিক, তবে এর কিছুক্ষন পর নিজের পাছায় নিজের লাথি মারতে ইচ্ছা করলো, এখন বুঝতে পারছি বেচারা ইটালিয়ান ম্যাডামের এমন দুরাবস্থার কারন, আঙ্গুল জমে যাচ্ছে। উজ্জল ঝকঝকে সূর্যের নীচে কি ভয়ংকর ঠান্ডা লাগে এটা অনুভব করার জন্য এমন বরফে দাঁড়িয়ে থাকা দরকার, সূর্যটাকে টেনে এরও কিছুদুর নামানো গেলো হয়তো ভালো লাগতো, তবে কেয়ামত আসন্ন না, সূর্যেরও নীচে নামার কোনো সম্ভবনা নেই। আঙ্গুল জমে যাচ্ছে মনে হচ্ছে নিজের পাছায় আঙ্গুল ভরে বসে থাকি, প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে চমকে বের করে দিলাম, এমন ঠান্ডার ঠান্ডা, শালর যম ঠান্ডা হয়ে আছে। এর পর অবসাদ, ক্লান্তি, সামনের মানুষগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে ওদের অসীম জীবনিশক্তি, আমি বড়জোড় 200 ফুট গিয়েছি, উঠেছি বড়জোড় 50 ফুট, ওখান থেকেই নেমে আসতে হবে, সব হিসাব করে একটা দৌড় দিলাম, অবেেশষে রাস্তায় এসে কুকুরের মতো জিভ বের করে হাঁপাচ্ছি। এর পর সিগারেট ছেড়ে দিবো, দমের সমস্যা হচ্ছে এই সিগারেটের জন্য, আমরা এসেছি 3 জিপে করে কিন্তু বাকি সবাই কোথায়?
একে একে সবাইকে দেখা যায়। যারা ভাড়া করে এনেছিলো কাপড় তারাই সুখে আছে, তারা সেই কাপড় পড়ে বরফের ভেতরে হাঁটছে আম আমি ঠান্ডায় কুঁকড়ে আছি ঝিনুকের মতো। আমি অসহ্য ঠান্ডায় অপেক্ষা করতে থাকি কখন ওদের বরফ বিলাস সমাপ্ত হবে আর আমি এই বরফের দোযখ থেকে মুক্তি পাবো।
হোটেলের প্যাসেজ সংকীর্ন বড়জোড় 4 ফুট চওরা হবে, এর 2 পাশেই রুম, তবে 2 বিছানার রুমের সংখ্যা বেশী, এত বিলাসিতা আমাদের পোষায় না বলেই সমস্যা বেধেছে, আমাদের সামনের রুমে উঠেছে রহিমা, উর্মি,সবাই নিজেদের রুমে ব্যাগ রেখে এসেছে, তবে সেই একটা নীচ তলার রুমে কে যাবে এই নিয়ে কোনো মীমাংসা হয় নি। লিটু ভাই যখন বললো তিনিই ঐ রুমে যাবেনা তখন আমরা সবাই লজ্জিত, আপনি কেনো যাবেন, আমরা কেউ একজন যাবো, আপনি উপরে একটা রুম ঠিক করেন, কোনো সমস্যা নাই।
নীচের রূমের প্রধান সমস্যা ওটা স্যাঁত স্যাঁতে, ঠান্ডাও বেশি, আর এই শালার হোটেল মালিকরা কোনো রুম হিটিংএর ব্যাবস্থা রাখে নি, ওটা নিজের পয়সায় নিতে হবে ভাড়া। বিকালে এক কেলেংকারি হয়ে গেছে, এ যাবত কালের সবচেয়ে বড় কেলেংকারী। রাজ্যগুলোর নিজস্ব সীমানা আছে, যেখানে চেকপোষ্টও আছে, এমন একটা চেকপোষ্টে আমাদের জীপ থামানো হলো, পেছনের বাস তখন অনেক অনেক দুরে, বাস থেকে সবাই হাসিমুখে নামলাম, চৌহান আছে, ও আলাপ করলো পুলিশের সাথে, পুলিশ 11 জন উঠতি যুবককে দেখে জীপ সার্চ করতে চাইলো, অবশ্য না চাওয়ার কোনো কারন দেখি না, আমরা কেউই এখানে আসার পর শেভ করি নি, সবার গালেই খোঁচা খোঁচা দাড়ি, আর রাতে ঘুম কম হওয়ায় সবার চোখের নীচেই কালি পড়েছে। আমরা জীপ থেকে সরে গেলাম, জীপ থেকে একের পর এক মদের বোতল সাজানো হচ্ছে রাস্তায়। প্রায় 10টার মতো মদের বোতল রাস্তায়, এখানে এক অদ্ভুত নিয়ম আছে, এক রাজ্যের মদ অন্য রাজ্যে বিক্রি করা নিষিদ্ধ, এই এক আইনের গ্যাঁড়াকলে পড়লাম, মানালিতে আয়েশ করে খাবো বলে মদ সংগ্রহ করা হয়েছিলো, সেসবের মুখও খোলা হয় নি, সেসব দেখে শ্রদ্ধেয় পুলিশ সাহেব ঘোষনা দিলেন 1700 রুপি জরিমানা অথবা জেল হাজত, থানা পুলিশ, ক্যানো আমাদের উপর এই অত্যাচার, বললো মুখ বন্ধ অবস্থায় বোতল নিয়ে গেলেই এই কেস খাইতে হবে, তাকে যতই যুক্তিতে বোঝানোর চেষ্টা করি আমরা ছাত্র মানুষ, ভিন দেশি আমাদের নিজস্ব ব্যাবহারের জন্যই আমরা এসব নিয়ে যাচ্ছি, এসব নিয়ে বানিজ্যের কোনো ইচ্ছা আমাদের নেই, তাছাড়া কয়েকবোতল বীয়ার আর মদ নিশ্চই কেউ বানিজ্যিক ভিত্তিতে নিয়ে যাবে না। তবে পুলিশের উপমহাদেশীয় চরিত্র সবখানেই একই রকম, এখানে টাকার গন্ধ পাওয়া গেছে, তার কথা হলো মদের ঢাকনা যদি খোলা থাকতো তাহলে এটা কোনো সমস্যা ছিলো না, মর্তুজা গিয়ে বললো ঠিক আছে ভাই আপনি বোতল খুলে কয়েক চুমুক দিয়ে এসবের সতীত্বহানী করে এসবকে ভিন্ন রাজ্যে ব্যাবহার উপযোগী করে দেন। বেচারা এই কাজ করতে নারাজ, অবশেষে আমরা সবগুলোর ছিপি খুললাম, তবে জরিমানার টাকা কমলো না, অনেক দরকষাকষি চলছে, অবশেষে সাহেবের দয়ার শরীরে আঘাত লাগলো, তিনি 1200 রুপি জরিমানা নিয়ে আমাদের খালাস করবেন বললেন। লিটু ভাই আগুন হয়েছে ক্ষেপে সবাই পকেট আঁচড়ে যা হাতে উঠলো সব দিয়ে 1200 টাকা পুরিয়ে পুলিশ বাবাজীকে দেওয়া হলো। এবং আমরা জীপে ঢোকার আগেই বাস হাজির সেখানে, অবশ্য হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছি সবাই, যদি অন্য 2 সিনিয়ার স্যার এই দৃশ্য দেখতো যে আমরা 9 পাপী বান্দা এবং লিটু ভাই এক সারি মদের বোতলের সামনে পোজ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি তাহলে পরবর্তি শিক্ষকসভায় লিটুভাইকে ভেজে ফেলতো ওরা।
লিটু ভাই এর পর মিয়ারা এইটা দেখবা না, এই খানে লিখা আছে, অবশেষে সবাই মদের বোতলের ছোটো ছোটো লেখাগুলো পড়লো, সেখানে লেখা আছে এটা যে রাজ্যে তৈরি হয়েছে শুধু সেই রাজ্যেই বিক্রয়যোগ্য, অন্য কোনো রাজ্যে এটাকে বিক্রয় করা ইন্ডিয়ান পেনাল কোডের মতে অপরাধ, জরিমানা এত- এসব ইনফরমেশন কে জানতো, ঠেকায় না পড়লে হয়তো আমরাও খেয়াল করতাম না, বোতলের পর্সেন্টেজ আর নাম এর বাইরে কেউ মদের বোতলের অন্য কিছ ু পড়ে বলে মনে হয় না।
সেই মদ্যপান হবে, লিটু ভাইকে নীচের স্যাঁত স্যাঁতে রুম ছেড়ে দিতে গিয়ে আবার সবার ভেতরে একই সন্দেহ, লিটু ভাই বিকালের ঘটনায় মাইন্ড খাইলো কিনা কে জানে। লিটু ভাইয়ের রুমের সামনে ছোটো একটা ব্যালকনির মতো, সেখানে সোফা রাখা আছে 3টা। ওখানে বসে আড্ডা দেওয়া হবে ভালো ভাবে, বাবুর্চি রান্না করছে ,সেই একই মেনু, এবং রান্নাও জঘন্য, তবে খেতে হবেই, কোনো অগ্যতা নেই। খাওয়ার ডাক এসেছে, লিটু ভাই গোসল করতে গেলো, আমরা উপর যে যার রুমে গেলাম, অভিযোগের পরিমান নগন্য এখানে, মানে অন্য সব হোটেলের মতো সবাই একই অভিযোগ নিয়ে আসছে না, জানালার কাঁচ ভাঙা, বিছানার চাদর বদলানো হয় নি, এসব অভিযোগ শুনলে মেজাজ আরও খঁচে যায়। একজন আসলো তার রুমের গরম পানি কাজ করছে না, অতএব আরেকজনের রুম তাদের দেওয়া হলো। সেই রুমের মানুষেরা আবার অন্য এক রুমের হিজরত করলো। সেখানে গীজার ছাড়া হয়েছিলো তবে মানুষের বড় তাড়াহুড়া, তারা সামন্য অপেক্ষা করলেইংরম পানি পেতে পারতো।
আমার সেই 2 ফুট বাই 2 ফুট তোয়ালে দিয়ে ভালোই গোসল হচ্ছে, তবে গোসলের পর পর দাঁতে দাঁতে ঠকঠক বিষয়টা খুবই ভয়ংকর অনুভব, আমি ঘোষনা দিলাম এই চোটে আমার সব দাঁত খসে পড়বে কার্টুনের মতো, তা খসে নি, আমরা সবাই দল বেঁধে নিচে গেলাম, খাওয়ার রুমে, হোটেলর লোকেরা দয়া করে থালা গ্লাস সরবরাহ করেছে, সেই থালায় গরম ভাত, একটু শব্জি, সালাদ, মুরগি দিয়ে আহার সারো, সঙ্গে একমাত্র সঞ্জয় সাহা ভিন্ন কোনো হিন্দু নেই, তবে তার সম্মানে সবার গরু খাওয়া বন্ধ, অবশ্য ভালোই হয়েছে, এই বাবুর্চির যেমন রান্না ওটা খাওয়ার কোনো মানে হয় না। খাওয়ার পর লাইন বেঁধে থালা ধোও, এবং শুচিবাই সম্পন্ন আরও মানুষ আছে তারা তখনও থালা ধোয়া শেষ করতে পারে নি, বারবার ধুয়ে কি করতে চাইছে আমি জানি না।
খাওয়ার পর আমরা সেই কনফারেন্স রুমে গেলাম, তানভীর আজকে উদার, সে মদের বোতল খুলে বসে আছে, সবাই ভেতরে ঢুকছে সে এক পেগ করে ঢেলে দিচ্ছে, লিটু ভাই, আশফাক রুমমেট বলে আগেই কাজ সেরেছে, এর পর যারাই আসছে তারাই একবার করে ঢু মেরে আসছে তানভীরের মদ। ফ্রি, তবে মদপায়ি মানুষের সংখ্যা কম, রুবেল তমাল ছুবে না, মর্তুজাও ছুবে নাম, মর্তুজার বীয়ারে আপত্তি নাই, হার্ড লিকারের ভক্ত লুকু, সেও একচোট খেয়ে ফিরে আসলো। সিগারেট চলছে , একটা প্যাকেটকে এ্যশট্রে বানিয়ে ভালোই জমিয়ে তোলা হয়েছে আড্ডা। এসময় যুঁথি আসলো উপর থেকে ওদের রুম সিঁড়ির ঠিক পাশে, সিঁড়ির সামনেই আমরা বসেছি, তবে ওর রুম আমাদের ঠির 2 তলা উপরে। যুঁথি আসার পর ওকে পাঠানো হলো রুমের ভেতরে, ও এডভেঞ্চারাস মেয়ে, তাই ওকে যখন বলা হলো ভেতরে প্রসাদ বিতরিত হচ্ছে, আমরা সবাই একবার করে প্রসাদ খেয়ে এসেছি, যুঁথি ভেতরে ঢুকলো, এবং ছিটকে বের হলো, এবং দৌড় দিলো সিঁড়ি দিয়ে, প্রথম সিঁড়ির শেষ মাথায় হোঁচট খেলো, ভয়ংকর হোঁচট, এবং খোঁড়াতে খোঁড়াতে উপরে উঠলো।
পেছনে হাসির তুফান, আমরাও হাসছিলাম তবে পড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে আমরা চুপ। তানভীর কি বলেছিলো যুঁথিকে? বিশেষ কিছু না, যুঁথি ঢোকার পর ও হাতে একটা গ্লাস তুলে বলেছিলো, যুঁথি মাল খাবা? মাল? অবশ্য তানভীরের ভাষ্যে মাল নিছকই মদ, অন্য কিছু না, যেমন টা আমরা আড্ডা ব্যাবহার করি সে অর্থে যে ব্যাবহার করে নি। যুঁথি কি আঁতকে উঠেছিলো, বিভিন্ন রকম অনুমান চলছে সোফায়। শামিক কিছুক্ষন পর বললো দোস্ত ঘটনাটা ঠিক হইলো না, চলো যুঁথিকে সরি বলে আসি। আমি কি করার একটা সিগারেট জ্বালিয়ে চললাম যুঁথিকে সরি বলতে। আইভি, স্বর্না যুঁথি এক রুমে, যুঁথি গিয়েই দরজা বন্ধ করে দিয়েছে, আমরা বন্ধ দরজার এপাশে অনুনয় করছি খোলো খোলো দ্্বার রাখিও না আর বাহিরে মোদের দাঁড়ায়ে, স্বর্ণা দরজা খুলে একচোট ঝাড়ি নিলো। আমরা সাধুবাবার মতো মুখ করে বললাম য ঘটেছে ওটার সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই, আমরা শিশুর মতো নিষ্পাপ। তবে যুঁথি বের হওয়ার নাম নেই, অবশেষে মহাত্বনের দয়া হলো, তিনি বললেন আমি ঠিক আছি তোমরা যাও। বাইরে দাঁড়িয়ে নাটক করিও না।
আমরা বললাম পা ঠিক আছে তো?
আমি বললামই তো আমি ঠিক আছি, আর পাকনামি করতে হবে না যাও নীচে যাও, হা হা হি হি করো।
অবস্থা সুবিধার না, আমি নিজে কেনো এখানে দাঁড়িয়ে আছি বুঝতেছি না, আমার এইসব কথা বার্তা হজম হয়, এর মধ্যে শমিক বলে বসলো তুমি বাইরে না আসা পর্যন্ত আমরা দরজা থেকে নড়বো না, তুমি দরজা খুলে বলে তুমি ঠিক আছো, তাহলে আমরা এখান থেকে চলে যাবো।
যুঁথি অবশেষে দরজা খুলে বের হলো, বেচারার পা মচকে গেছে, একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাটছে। শমিক পা ধারয় ওস্তাদ, তবে সে পীড়াপীড়ি করে যুঁথিকে নিচে নামতে রাজী করালো, যুঁথি খোঁড়াতে খোঁড়াতে নীচে আসলো। আমাদের সাথে গোটা 2 সিগারেট টেনে বেচারা চলে গেলো।
একটা পর্যায়ে লিটু ভাই বললো ঘুমের সময় হয়েছে, তোমরা এখানে আড্ডা দিতে পারো আমি গেলাম ঘুমাইতে। তানভীরের কয়েকটা পোট্রেট তুলে লিটু ভাইবিহীন আড্ড া এখানে টানার কোনো মানে হয় না এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা যে যার ঘরে ফিরে গেলাম। যাওয়ার পথে দেখি রহিমা দরজার বাইরে, আররে রহিমা সুন্দরি এইটু এই ঘরে আসো।
ক্যানো?
আরে বাবা আসোই না, এই হোটেল ভর্ত মানুষের মাঝখানে তো তোমাকে কিছু করবো না ভয়ের কি আছে?
রহিমা ঘরে ঢুকলো, এইবার আসলাম বলো কি বলবা?
একটু হাসি দিয়া যাও, এর পর থেকে ডাকলে একটা কইরা হাসি দিয়া যাইবা।
রহিমা হাসি দিয়ে বললো, এইবার ঠিক আছে?
আমি আর শমিক বুকে হাত দিয়ে উলটে পড়ে বললাম হ 100% ঠিক।
কেউ নাই ঘরে, পাশের ঘরেও কেউ নাই। কই গেলো জনগন? অবেশেষে অন্য এক রুমে দেখা পাওয়া গেলো ওদের, বাবু মুখ হাঁ করে ঘুমাচ্ছে, জামাল জসিম কাইত হয়ে পড়ে আছে। হালকা আড্ডা হচ্ছিলো, তবে পরদিন রোটাংপাস যাওয়া হবে সকাল সকাল তাই সবাই আসলে বিছানায় যাবে।
পরদিন সকালে যা ঘটলো ওটার জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না, তমাল যাবে না ও অসুস্থ বোধ করছে, এছাড়া আইভিও অসুস্থ, ওকেও দেখতে হবে, শিক্ষকেরা যাবে না কেউ, তারাও এই 21 ঘন্টার ভ্রমের ধাককা সামলাতে পারছে না, স্বর্ণা যাবে না, রুবেল যাবে না। অতএব এইসব প্যানপ্যানাইন্যা মানুষকে পিছনে রেখে যার যার ইচ্ছা তারা রোটাংপাস যাবে এই ঘোষনা হলো। সবাই সেই মতো নীচে নামলো। সিরাজ এসে বলে তোমরা এইখানে আসার পর সব মজা লুটতেছো। তামরা জীপ নিয়া ঘুরাঘুরি করো, আমাদের একবারও বললা না? তোমাদের কথামতো সব চলবে না কি?
মেজাজ আগুন হয়ে তিড়িং বিড়িং করছে, অথচ কি বলবো বুঝতে পারতেছি না । অধিক রাগে বাক্যহীন অবস্থা। আশফাক মুখ খুললো, দোস্ত দেখো এই জীপটাতো কারো বাপের সম্পত্তি না, তোমরা যাইতে চাইলে যাবা, কেউ তো বাঁধা দেয় নাই তোমাদের, যখন দিল্লিতে জীপটা নেওয়া হয়েছিলো তখন কেউ চড়তে রাজী ছিলা না। কাউকে না কাউকে সউাক্রিফাইস করতে হতো, সেই কাজটা আমরাই করছি, এর আগে ট্রেনের বগি ছেড়ে আমরা অন্য বগিতে গেলাম, এবারও ঠিক একই কাজ করেছি।
লুকু আসলো, ও বললো কোনো ঝামেলায় যাওয়ার দরকার নাই, তমালের সাথে প্রথম দিন কথা হইছে, ও বলছে ওরা চাইতাছে টু্যরটা ভন্ডুল হয়ে যাক, আমরা এরেঞ্জ করছি ঐটা ওরা সফল হইতে দিবে না। ওদের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাবি না। নিজেরা মানায়া চল তবে কোনো ঝামেলা করিস না। তোরা বাসায় থাকিস, আমাকে রুবেলকে মর্তুজাকে হলে থাকতে হবে। তোরা তখন কি করতে পারবি বল।
সুতরাং আমরা সুবোধ বালক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম, বললাম গো এহেড ভাইয়েরা, তোমরা জীপে উঠে পড়ো আমাদের কোনো আপত্তি নাই এ বিষয়ে। আমরা ব্যাগ নামিয়ে বাসে রাখলাম, সিরাজ, মানিক, পলাশ, চন্দন, দুলাল, সঞ্জয়, টিপু একে একে উঠে পড়লো জীপে সেখানে লিটু ভাই যাবে। শিক্ষক যাবে না তবে তার ইটালিয়ান বৌ যাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে। তাকে সহ আমরা বাসে উঠলাম। অনেক অনেক দিন পর সবাই চলতি পথে আড্ডা দিবো, এই দিনটাতেই রুবলে তমাল আইভি স্বর্না নাই, কি আর করার। আমরা বাসের জানালা দিয়ে বিস্ফোরিত চোখে প্রকৃতি দেখি।
বাসঘুরে আমরাও মাথা ঘুরাই, সিগারাট টানি ঘন ঘন, সীটের উপরের হাতলে বসে আছি, সীটের উপর পা দিয়ে, ড্যাম কেয়ার একটা ভাব সব সময় চোখে মুখে, পথে একটা জায়গায় সবাই থামিয়ে বরফউপযোগী ড্রেস ভাড়া নিলো, বোটকা, ভয়ংকর গন্ধ, আমি নিতে রাজি না, এই জিনিষ গায়ে চাপালে গন্ধে মারা যাবো, শীতে মারা যাওয়া গন্ধে মারা যাওয়ার চেয়ে ভালো সমাধান। সবাই না নিলেও কেউ কেউ ভাড়া নিলো সেই ড্রেস। এর পর বাস কিছুটা সামনে এসে থামলো। এর পরের রাস্তায় বরফ জমেছে, ওখানে বাস চালানো যাবে না। তাই আমাদের এখান থেকেই ফিরে যেতে হবে। আমরা মারমুখি হয়ে যাই, রোটাং পাসের বরফ হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করবো বলেই না এত দুর ছুটে আসা, আবহাওয়াও তেমন ভয়ংকর না, তাহলে কেনো আমাদের বঞ্চিত হতে হবে বরফশীর্ষ দেখা থেকে।
এসব সময়ে কারো উন্মাদনা ভালো কাজ করে, লুকু যখন প্রথ ম জনপ্রতি 100টাকা হারে জীপ ভাড়া করে ফেললো তখন সবাই একসাথে সিদ্ধান্ত নিলো সবাই যাবে ওখানে আর জীপে করেই যাবে। এক জীপে আঁটবে 12 জন, বাস আছে 35 জন, তাই তারা 3 জীপেই এঁটে গেলো। জিপ রওনা দিলো পাহাড়ি পথে, রোমহর্ষক সে ভ্রমন, রাস্তা 15 ফুটের মতো চওড়া, এর মধ্যে 60 কিমি বেগে জিপ চলছে, রাস্তার এক পাশে পাহাড়ের দেয়াল, অন্য পাশে গভীর খাদ, যাট কোনো তলা দেখা যাচ্ছে না, প্রায় 100 ফিট চওড়া নদীটাকে ঝকঝকে রুপালী ফিতার মতো দেখা যাচ্ছে, অবশ্য একজন বললো বলেই ওটাকে নদী ঘোষনা দিলাম, নীচে পাহাড়ী গাছ, ঝোপঝাড়, সবই দেখা যাচ্ছে তবে সবাগুলো আকার মিনিয়েচার। পাশাপাশি 2টা জিপ চললে মাঝে কয়েক ইঞ্চির ব্যাবধান থাকে, এর মধ্যে 60 কিমি বেগে চালানো, পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হাওয়ার ঝাপটা লাগে গায়ে। আমার পাশে শ্রদ্ধেয় ইটালিয়ান ম্যাডাম, মাসুম তার সাথে খাজুইর্যা প্যাঁচাল দিচ্ছে, আচ্ছা আপনাদের ভাষায় আই লাভ ইউ কিভাবে বলে। জীপের ছোটো পরিসরে গায়ে ঘষা লাগছে, আমি অন্য পাশে তাকিয়ে সিগারেট ধরাই, অনুমতির তোয়াককা না করেই, অভ্যবত্যার কোনো প্রশ্ন নেই, সমস্ত বাসে সিগারেট টানতে টানতে আসলাম এখন পাশে বসে যদি অনুমতি প্রার্থনা করি সেটা খেলো শোনায়।
তখনই দেখলাম সেই পাথরটাকে, প্রায় 1500 মিটার লম্বা একটা পাথর, একটাই পাথর সটান খাড়া, ওটার আশে পাশে কিছু নাই, কুতুব মিনারের মতো বিশাল একটা পাথর, ওটার অনেক নীচে লাল পাথর দেখা যাচ্ছে। এই পাথরের জন্ম আগ্নেয় গিরির লাভা থেকে। পাললিক পাহাড় যেমন আমাদের দেশে দেখা যায় তেমন না, এটা গ্রানাইটের চুঁড়া, এবং লোহার পরিমান বেশী বলেই লাল, এছাড়া অন্যসব গ্রানাইটের কালো হওয়ার কথা। যদিও এ বিষয়ে ঘোষনা দেওয়াও ঠিক না, তবে কালো গ্রানাইট শব্দটা বইয়ে পড়েছি বলেই মনে স্থির ধারনা গ্রানাইট হলেই কালো হতে হবে।
ঐ একটা পাথর দেখলে ভেতরটা ভয়ে শীতল হয়ে যাচ্ছে, ঠান্ডা একটা স্রোত নামছে মেরুদন্ড বেয়ে। যেভাবে গতির প্রতিযোগিতায় মেতেছে এরা তাতে একবার পথহারা হলে সোজা নীচে 1500 মিটার নীচে গিয়ে পড়তে হবে। এমন একটা বাঁকের সামনে দেখি ইটালিয়ান ম্যাডাম আমার হাত আঁকড়ে ধরে বসে আছে শক্ত হয়ে। আমি আশ্বাসের হাসি দেই তাকে। বললাম ইটালিতে তো আল্পস আছে, ওখানের রাস্তা এরকম না?
ওখানেও কি পাহাড়ের চুঁড়ায় বরফ আছে।
ইটালিতে থাকলেই সবাই আল্পসে চড়ে না। আসলেই কথা সত্য বাংলাদেশের কক্সবাজারে কতজন গেছে, বাংলাদেশের 85% মানুষ জীবনে কোনোদিন কক্সবাজার যায় নি। এমন কি একটা জরিপে পড়েছিলাম পৃথিবীর 70% মানুষ তার জন্মস্থান থেকে 150 মাইল পরিধির বাইরে যায় না জীবনেও। সবাই সেই 150 মাইল বৃত্তের ভেতরে বাস করে, আমরা সেই 30% মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছি, যারা বাইরে যাচ্ছে, বাংলাদেশের অনেকেই ঢাকায় আসে নি, এটাও কারো কারো কাছে সেই 150 মাইলের সীমানার বাইরের দেশ।
অবশেষে জীপ থামলো এক জায়গায়, লিটু ভাইদের কোনো পাত্তা পাওয়া যাচ্ছে না, যেখানে বাস থেমেছে তার সামান্য কিছুদুর পরেই একটা মাইল ফলক, ওটার থেকে একটু দুরে চীনের সীমান্ত।আর চীনের সাথে ভারতে সীমান্ত বিষয়ক জটিলতা আছে তাই ও জায়গাটা মিলিটারি পার্সোনালদের জন্য সংরক্ষিত। তবে অন্য পাশে যা আছে ওটার তুলনা ওটা নিজেই, 30 গজ সামনে আগালেই বরফ, সাদা বরফ, আর ঐ বরফ ধীরেধীরে উঁচু হয়ে একটা চুড়া তৈরি করেছে, আমরা একটা শৃঙ্গের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
অনেক মানুষ, সবাই কয়েক পরত কাপড় পড়ে আছে, কেউ কেউ স্কিবোর্ড নিয়ে এসেছে, তারা ওটা পায়ে লাগিয়ে নামার চেষ্টা করছে, বরফে ধুপুস করে পড়ছে, এবং খিলখিল করে হাসতে হাসতে উঠছে।
আমার পায়ে চটি, পড়নে একটা শার্ট আর 150 টাকার জ্যাকেট। আমিও পায়ে পায়ে বরফের দিকে হাঁটি। বরফে উঠে পড়ি একটা সময়, বরফে পা ঢুকিয়ে হাঁটার আনন্দ অন্য রকম, এখানে হিউমিডিটির পরিমান আরও কম। সুর্যের আঁচ গায়ে বিধছে, আমি জ্যাকেট খুলে শুধ ু শার্ট পরে হাঁটি বরফের উপরে। অবশ্য এটাই সমস্যা, বরফের সামনে আসার পর প্রথম 15-20 মিনিট কোনো ঠান্ডা অনুভব হয় না। এর পর ধীরে ধীরে ঠান্ডা লাগতে থাকে। কিছুদুর হাঁটার পর দেখলাম পায়ের নফ ব্যাথা করতেছে। ফ্রস্ট বাইট বলে একটা বিষয়ও আছে, এখানে বরফের ভেতর ফ্রস্ট বাইট হলে শেষে আঙ্গুল কেটে বাদ দিতে হবে, এতটা ঝুঁকি নেওয়া যায় না। আমি আড়াআড়ি হেঁটে দ্্রুত বরফ পার হই, সামনে পাইলাম তানভীরকে,
কি রে কই যাস তুই,
একটু পেসাপ করবো,
চল আমিও ঐ কাজ করুম। অতএব আমরা পাহাড়ের উপরে দাড়িয়ে মুতলাম, এটার জন্য খানিকটা পথ হাঁটতে হলো, এর পর গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে জীপের পাশে বসলাম, সেখানে ইটালিয়ান ম্যাডাম বসে আছে, জিজ্ঞাসা করলাম সমস্যা কি, বরফে না গিয়ে এখানে বসে থাকার মানে কি।
বললো গ্লাভস নাই, আমি বললাম কোনো সমস্যা নাই, আমার কাছে একজোড়া আছে, আমি ব্যাবহার করছি না, তুমি নিতে পারো। বেচারার আঙ্গুলের নখ নীল হয়ে গেছে। বেচারার সাথে এককাপ কফি নিয়ে বসলাম, আমরা সবাই বরফে যাবো বেচারা রাস্তার উপরে একা একা বসে থাকবে বিষয়টা দৃষ্টিকটু লাগে। সেই গরম কফির কাপ ধরে বেচারা আংগুলে উষ্ণতার পরশ লাগাচ্ছে, আমার মন পড়ে আছে সেই পাহাড়ের চুঁড়ায়। তানভীর পাহাড়ে যাবে না, ও একটা ভীতুর ডিম, ওর ভিতরে এডভেঞ্চার এ টাও নাই। আমি অনুরোধ করে হাতের গ্লাভসটা তাকে দিলাম। এর পর আবার হাঁটা শুরু করলাম বরফের উপর দিয়ে।
কিছুদুর হাঁটার পর আর পারি না, ঘনঘন শ্বাস নিচ্ছি, পাহাড়ের উপরে বাতাসের চাপ কম, বাতাসের ঘনত্ব কম, এটাই বোধ হয় স্বাভাবিক, তবে এর কিছুক্ষন পর নিজের পাছায় নিজের লাথি মারতে ইচ্ছা করলো, এখন বুঝতে পারছি বেচারা ইটালিয়ান ম্যাডামের এমন দুরাবস্থার কারন, আঙ্গুল জমে যাচ্ছে। উজ্জল ঝকঝকে সূর্যের নীচে কি ভয়ংকর ঠান্ডা লাগে এটা অনুভব করার জন্য এমন বরফে দাঁড়িয়ে থাকা দরকার, সূর্যটাকে টেনে এরও কিছুদুর নামানো গেলো হয়তো ভালো লাগতো, তবে কেয়ামত আসন্ন না, সূর্যেরও নীচে নামার কোনো সম্ভবনা নেই। আঙ্গুল জমে যাচ্ছে মনে হচ্ছে নিজের পাছায় আঙ্গুল ভরে বসে থাকি, প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে চমকে বের করে দিলাম, এমন ঠান্ডার ঠান্ডা, শালর যম ঠান্ডা হয়ে আছে। এর পর অবসাদ, ক্লান্তি, সামনের মানুষগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে ওদের অসীম জীবনিশক্তি, আমি বড়জোড় 200 ফুট গিয়েছি, উঠেছি বড়জোড় 50 ফুট, ওখান থেকেই নেমে আসতে হবে, সব হিসাব করে একটা দৌড় দিলাম, অবেেশষে রাস্তায় এসে কুকুরের মতো জিভ বের করে হাঁপাচ্ছি। এর পর সিগারেট ছেড়ে দিবো, দমের সমস্যা হচ্ছে এই সিগারেটের জন্য, আমরা এসেছি 3 জিপে করে কিন্তু বাকি সবাই কোথায়?
একে একে সবাইকে দেখা যায়। যারা ভাড়া করে এনেছিলো কাপড় তারাই সুখে আছে, তারা সেই কাপড় পড়ে বরফের ভেতরে হাঁটছে আম আমি ঠান্ডায় কুঁকড়ে আছি ঝিনুকের মতো। আমি অসহ্য ঠান্ডায় অপেক্ষা করতে থাকি কখন ওদের বরফ বিলাস সমাপ্ত হবে আর আমি এই বরফের দোযখ থেকে মুক্তি পাবো।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
পোস্টটি ০ জনের ভাল লেগেছে, ০ জনের ভাল লাগেনি
১. ১৩ ই অক্টোবর, ২০০৬ সকাল ৮:২০
উৎস বলেছেন: রাসেল, এই লেখাগুলো ছবি সহ আপনার কোন ইউনিকোড ব্লগ সাইটে স্থায়ী ভাবে রাখলে ভালো হতো। সাময়িক লেখার ভীড়ে হারিয়ে যাওয়ার মতো নয়।
উৎস বলেছেন: রাসেল, এই লেখাগুলো ছবি সহ আপনার কোন ইউনিকোড ব্লগ সাইটে স্থায়ী ভাবে রাখলে ভালো হতো। সাময়িক লেখার ভীড়ে হারিয়ে যাওয়ার মতো নয়। ২. ১৩ ই অক্টোবর, ২০০৬ সকাল ৮:২২
অতিথি বলেছেন: ছবি নাই, দেখি একদিন শমিকের কাছে ধার চাইতে হবে, ওর কাছে 25 রীল ছবি, বেচারা টু্যরের পর ফতুর হইছে ছবি প্রিন্ট নিয়া।
অতিথি বলেছেন: ছবি নাই, দেখি একদিন শমিকের কাছে ধার চাইতে হবে, ওর কাছে 25 রীল ছবি, বেচারা টু্যরের পর ফতুর হইছে ছবি প্রিন্ট নিয়া। ৩. ১৩ ই অক্টোবর, ২০০৬ সকাল ৮:৩৯
অতিথি বলেছেন: উৎস'র সাথে সম্পূর্ণ একমত। অবশ্য অবশ্যই এটা ইউনিকোডে কনভার্ট র করুন এবং সবগুলো একটা পোস্টে দিয়ে এখানে সেইভ করে রাখুন। আপনি যদি না করতে চান, তবে আমি করে আমার ব্লগে এটাকে রাখবো। আর একটা কথা ফর দ্যা ফার্স্ট টাইম ব্লগকে আমার অত্যন্ত সমৃদ্ধ মনে হচ্ছে। রিয়েলী আই মিন ইট ফর ইউর রাইটিং।
অতিথি বলেছেন: উৎস'র সাথে সম্পূর্ণ একমত। অবশ্য অবশ্যই এটা ইউনিকোডে কনভার্ট র করুন এবং সবগুলো একটা পোস্টে দিয়ে এখানে সেইভ করে রাখুন। আপনি যদি না করতে চান, তবে আমি করে আমার ব্লগে এটাকে রাখবো। আর একটা কথা ফর দ্যা ফার্স্ট টাইম ব্লগকে আমার অত্যন্ত সমৃদ্ধ মনে হচ্ছে। রিয়েলী আই মিন ইট ফর ইউর রাইটিং। ৪. ১৩ ই অক্টোবর, ২০০৬ বিকাল ৫:৫৬
অতিথি বলেছেন: আমি ব্যক্তিগত ভাবে এবং ''জামার্ন ভাষা শিক্ষা আসর'' এর পক্ষ থেকে আপনাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি ।
আমরা ব্লগে একটি সুষ্ঠ স্বাভাবিক সংস্কৃত চর্চার উদ্যোগ নিয়েছি ।
এতে আমরা পথিক সাহেব সাহেব, ফ্রুলিংক্স সাহেব, সুমন চৌধুরী সাহেব, তীরন্দাজ সাহেব এবং আরও যারা জামার্ন ভাষার সাথে অনেক আগে থেকেই যুক্ত তাদের কাছ থেকে একান্ত সাহায্য কামনা করছি ।(কারণ অনেকের নাম আমার অজানা)
আপনি যদি আমাদের সাথে অংশগ্রহণ করেন তাহলে আমরা এবং আমি ব্যক্তিগতভাবে কৃতজ্ঞ হব । প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য [link|http://www.somewhereinblog.net/rifat/post/21193| GL
অতিথি বলেছেন: আমি ব্যক্তিগত ভাবে এবং ''জামার্ন ভাষা শিক্ষা আসর'' এর পক্ষ থেকে আপনাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি ।আমরা ব্লগে একটি সুষ্ঠ স্বাভাবিক সংস্কৃত চর্চার উদ্যোগ নিয়েছি ।
এতে আমরা পথিক সাহেব সাহেব, ফ্রুলিংক্স সাহেব, সুমন চৌধুরী সাহেব, তীরন্দাজ সাহেব এবং আরও যারা জামার্ন ভাষার সাথে অনেক আগে থেকেই যুক্ত তাদের কাছ থেকে একান্ত সাহায্য কামনা করছি ।(কারণ অনেকের নাম আমার অজানা)
আপনি যদি আমাদের সাথে অংশগ্রহণ করেন তাহলে আমরা এবং আমি ব্যক্তিগতভাবে কৃতজ্ঞ হব । প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য [link|http://www.somewhereinblog.net/rifat/post/21193| GL

