মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১০

২৫শে বৈশাখ

সময়ের স্রোতে কভু পলি জমে যদি
তবুও বয়ে চলে জীবনের নদী

গানটা মাথার ভেতরে থেকে থেকে ঘাঁই মারে, স্মৃতির আলোড়ন উঠে, মনে হয় কথাগুলো ভীষণ রকম সত্য- জীবন পানির মতো- প্রতিটা মুহূর্ত মাত্র ১ বার বেঁচে থাকা যায়- যে মুহূর্ত চলে গেলো সে মুহূর্ত ফিরে পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই-

বালির উপরে দু এক ফোঁটা বৃষ্টির মতো জীবন- বৃষ্টিটা সত্য হলেও ভীষন সত্য তার মিলিয়ে যাওয়া- এই থাকা না থাকার দ্বন্দ্বটাও ভীষণ রকম সত্য- অসময়ের উটকো বৃষ্টি, হতচ্ছারা চলে গেলেও বালিতে দাগ রেখে যায়-

সেই দাগ আর গন্ধটুকু বৃষ্টির স্মৃতি- স্মৃতিতে অবিরাম বৃষ্টি ঝড়লেও কোনও বাস্তবের ভূমিতে তার ছোঁয়া লাগে না- খানিকটা গর্ত আর চারপাশে কয়েকটা গোলাকার ফোঁটা অকাল শ্রাবণের স্মৃতির ঝাপট দেয় ২৫শে বৈশাখ---

জলের মতোই বুদবুদ তুলে হারিয়ে যাওয়া সময়গুলোর দাগ থাকে নিউরনে- এই দাগগুলো জীবনের রেখা- অবিরাম রেখা তৈরি হতে থাকা- আড়াআড়ি- সোজাসুজি- আমরা জীবনের খাঁচায় আটকে যাই-

একই নিয়মে জীবনযাপনের পরও আমি জানি ২৫শে বৈশাখ ১৪০২এর মতো অন্য কোনো ২৫শে বৈশাখ আসবে না- আজকের ১২ই জৈষ্ঠ্য চলে গেলে এ দিনটাও ফিরে পাবো না- ১৩, ১৪, ১৯ ২৫, ৩১ এসব শুধুমাত্র সংখ্যা এই একই নিয়মে জীবনযাপনের ভেতরেও একই নিয়মে ঘুম ভেঙে এখই কথার গুঞ্জরণে কাটানো তবে এই দিনগুলোতে আবার বেঁচে থাকা সম্ভব হবে না কখনও-

সব সম্ভব হয় না- সব সম্ভব হয় না বলেই জীবনের মায়া এত বেশী- কানা বাউল দোতারা হাতে গাইছে
ও জীবন, জীবনরে
এ জীবন ছাড়িয়া গেলে আদর করবে কে জীবনরে-
বাউলের হাতের দোটারা টুংটাং করে, উপরের চামড়ার একপাশ ক্ষয়ে গেছে হাতের ঘষায়- রংটাও মলিন হয়েছে-

বাউলের পরনে সাদা শার্ট- শার্টটাও মলিন, সন্ধ্যার আবছায়াতে কিছুটা ছাই মনে হয়- পকেটের কোনা ছেঁড়া, কলারে ময়লা, মাথায় পরিপাটি চুল, সিঁথি করা- কপালের পাশ দিয়ে কয়েকটা চুল পড়ে আছে, সে চুলে রুপালি ঝিলিক

দৃশ্যটা পরিস্কার মনে আছে, ২৫ শে বৈশাখ, পাবলিক লাইব্রেরি থেকে হাঁটতে হাঁটতে ফিরছিলাম, সোহওয়ার্দির সামনের ফুটপাত দিয়ে- তখনও রাজু ভাস্কর্যের কাজ চলছে, জায়গাটা টিন দিয়ে ঘেরা, আর একটু সামনে গিয়ে ডানে টি এস সি- তার পাশে স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্ত্বর- তারও ওপাশে যাত্রীছাউনি- সেখান থেকে একটু এগিয়ে গেলে তোমার তখনকার স্থায়ী নিবাস- রোকেয়া হলের গেট দেখা যায়-
হঠাৎই ঝড় আসলো, বড় বড় ফোঁটাতে বৃষ্টি পড়ছে, সামনের রাস্তায় ধুলো উড়ছে, টি এসসির ভেতরের পাতাগুলো এদিকে অদিকে উড়ছে, পশ্চিমের আকাশ কালো, গাছের ডালপালা নড়ছে, আমি নিরাপদ আশ্রয়ের তাড়নায় ছুটতে চাইলাম, টিএসসির বারান্দা, নয়তো পেছনে ফেলে আসা যাত্রীছাউনি- তুমি বললে এসো ঝড় গায়ে মাখি, গায়ে মাখি বৈশাখি ঝড়-

আমার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ ঘুচে গেলো- মনে হলো এইতো জীবন, এই মুহূর্তকে আঁকড়ে ধরে বাঁচি আজ- কি আর হবে- গাছের ডাল ভেঙে মাথায় পড়বে- হয়তো মরে যাবো-

বৃষ্টির ঝাপট লাগছে গায়ে- বাতাসে উড়ছে তোমার ওড়না- অঝোর বর্ষণ নয়- শুধু হাওয়ার মাতলামি- কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি আটকে আছে তোমার চুলে- সে সময় মনে হলো-

মেঘ কালো আঁধার কালো আর কলংক কালো-
তোমার কালো চুলে বৃষ্টি আটকে আছে- বৃষ্টির কারাগার তোমার উদাস চুলে- কপালে লেপ্টে থাকা চুলের পাশে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি জল- তোমার গালের সতেজ সজলতা- তোমার চোখের উপরে হাত রেখে বাতাস আড়াল করার দৃশ্য\

তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারবো না- কখনই না-

আমরো দোয়েল চত্ত্বর হয়ে শহীদ মিনারে গেলাম, সেখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে আবারও টিএস সি- বড় বড় ফোঁটার বৃষ্টি থাকে না বেশী ক্ষণ তবে এটুকু সময়েই সোঁদা গন্ধে মৌ মৌ করছে চারপাশ- ম্লান সোডিয়াম আলোয় ঘাসের উপরে জমে থাকা বৃষ্টির অবশিষ্টাংশ দুলছে বাতাসে-

যখন যাত্রীছাউনির নীচে পৌঁছালাম তখন বৃষ্টি ধরে গেছে, ছাউনির নীচে অনেক মানুষের শরীরের তাপ আর স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ জমে আছে- এক একটা রিকশায় চলে যাচ্ছে মানুষ নতুন মানুষ জমছে-

তোমার ভেজা জামা ভেজা চুল ভেজা মুখ ভেজা আঙ্গুল আমার ভেজা টি শার্ট আর ভেজা স্যান্ডেলের নীচে জমে থাকা কাঁদা- প্রেম কিংবা অধিকারবোধ যাই বলো না কেনো- দুপাশের ঝুলে থাকা হাতগুলো দেখছিলাম তীক্ষ্ন চোখে- তোমাকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে ছিলাম- সে সম্য এই বাউলকে দেখলাম ছাউনির নীচে

বাউলের ছেঁড়া শার্টের পকেট আর সস্তা কাপড়ের প্যান্টে তেমন বিশেষত্ব ছিলো না- মোটা ভাঙা গলায় গানটাও তেমন ভালো লাগছিলো না- হয়তো গলায় বিষাদের ছাপটা ছিলো না জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত একটা মানুষের স্বর-

ও জীবন জীবনরে
এ জীবন ছাড়িয়া গেলে আদর করবে কে জীবন রে-

বাউলের পাশে ছোট একটা ছেলে তার হাতে খোল, পরনে শার্ট- শার্টটা ওর তুলনায় বেশ বড়ো- সামনের বোতার দুটো ছেঁড়া, আর শার্টের ঝুল প্রায় হাঁটুর কাছে, কালো গতর- চেকের হ্যাফ প্যান্ট উঁকি দিচ্ছিলো শার্টের ছেঁড়া বোতামের ফাঁক দিয়ে-

ছেলেটার গলা অনেক তীক্ষ- হঠাৎ টান দিয়ে সঙ্গত দিলো যখন বাবার সাথে সব কিছুই অর্থহীন মনে হলো- এই মুহূর্তটাই সত্যি- এই বেঁচে থাকা এর মূল্য কোথায়- বেঁচে আছি, নানাবিধ সম্পর্কে জড়িয়ে আছি, মরে গেলে কে আমার কে তোমার কে কাকে মনে রাখে-

মরবার সব কল্পনার ফানুস নিভে যায়- তোমার চোখে তাকাই উদাস চোখে- আমাদের বিকালের আদরের ছাপ তখনও স্মৃতিতে তরতাজা- আমরা পরস্পরের আঙ্গুল আঁকড়ে ধরে হঠাৎ আসা ঝড়ের পরের বিষন্নতায় মুঢ়-\
ছোটো ছেলেটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গায় আদর করবে কে জীবন রে

ছেলেটার মায়ের পরণে মলিন শাড়ী- মহিলার চোখে স্বপ্ন নেই, খাঁ খাঁ শুন্যতা- পাশে সম্ভবত তার মেয়ে, কালো ফ্রক পড়ে আছে, ফ্রকের হলুদ ফুল আর লালচে রুক্ষ চুল- অভাব আর দারিদ্রতার চলমান সাইনবোর্ড- আমার পকেট খুঁজে ১০ টাকা তুলে আনি, তোমার হাত ব্যাগ থেকে ৫০ টাকা বের হয়-

এ উপলব্ধির মূল্য পরিশোধ করা সম্ভব নয় তবুও কুণ্ঠিত হাতে ৬০ টাকা তুলে দেই ছোটো ছেলেটার হাতে- নিজে লজ্জিত হই- বিমর্ষ হই-

সেদিন আমাদের আলাপচারিতায় ঘুরে ফিরে আসে গানটা- তোমার ফেরার সময় হলো- আকাশ লালচে০ খুব বৃষ্টি হবে হয়তো একটু পরেই- তোমাকে হলে পৌঁছে দিয়ে আমাকে যেতে হবে ২৬ দিলু রোড মগবাজার

বিষন্ন মন নিয়ে আবার হাঁটতে থাকি, বৃষ্টি নেমেছে, আমার চুল আর টিশার্ট ভিজে জবজবে- আমি হাঁটতে হাঁটতে শাহাবাগ মোড় পার হই- গাড়ীর হেড লাইটে ঝকঝকে বৃষ্টি ঝড়তে দেখি- মলিন হলদে আলোয় লাইট পোষ্টের সমান্তরালে বৃষ্টি ঝড়ছে মলিন বৃষ্টি-

পিজির সামনে ভীড় করে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে বাসের অপেক্ষায়- বিষাদগ্রস্থ মন নিয়ে সোজা বাংলা মোটর- সেখান থেকে ডানে মোড় ঘুরে আরও অনেকটা আগাতে হবে- হঠাৎ লোড শেডিং শুধু বৃষ্টির শব্দ আর রিকশার টুংটাং- কুপির আলোতে সিগারেট দোকানি, দোকানের শেডের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের উৎসুক চোখ সব পেছনে ফেলে হাঁটতে থাকি-

বিষাদ মুছে যায় বরং মাথার ভেতরে অনবরত চিন্তা ঘুরতে থাকে ভেতরে যাওয়ার কোনো রিকশা পাওয়া যাবে- ও জীবন জীবন রে
এসব বৈকালিক বিষাদ আর গোপন আদরের উল্লাস আমাকে উজ্জ্বীবিত করে না- আমার সাম্প্রতিক সংকট ভেতরের পচা পানি না মারিয়ে কোনোভাবে বাসায় পৌঁছানো

এ ঘটনার কয়েক দিন পরেই বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে রটে গেলো তোমার ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকেরা কতিপয় ছাত্রীকে যৌননিপীড়ন করেছে- ভালো মার্কস দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অনৈতিক আচরণ করেছে তারা- আন্দোলন দানা বাঁধলো- এবং একজন অভিযুক্ত শিক্ষককে সাময়িক বহিস্কার করা হলো-

তোমর রেজাল্ট হলো কয়েক মাস পরেই- তুমি ফার্স্ট ক্লাশ পেয়েছো- এ সংবাদে তেমন আনন্দিত হতে পার না- তোমার ফেল করার সংবাদ হয়তো উল্লসিত করতো আমাকে-

তুমি হল ছাড়লে, তোমাকে ছেড়ে আসবার সিদ্ধান্ত নিতে অনেক কষ্ট হয়েছে- সার্বক্ষণিক সংশয় নিয়ে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো না- তোামকে আদর করতে গেলেই মনে হতো হয়তো অন্য কেউ এভাবেই- না তেমন কিভাবে হয়? তবুও আমার উত্তেজনা শীতল হয়- শিথিল হয়ে যায় সব-

তুমি নিয়মিতই আসতে ক্যাম্পাসে, আমার অবাধ্য পা তোমার খোঁজে ঘুরতো- তুমিও হয়তো খুঁজতে আমাকে, প্রত্যাখ্যানের অন্য কোনো কারণ ছিলো না- হয়তো তুমি ফার্স্ট ক্লাশ না পেলে আমাদের জীবন অন্য রকম হতো-

আমি বার বার তোমার দরজার সামনে দাঁড়িয়েছি- ফিরেও এসিছি নিঃশব্দে- সে সময়ই একটা কাজ পেয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম- একটা নিয়মশাসিত জীবন হলো-

ইচ্ছা থাকলেও আর সম্ভব হতো না যাওয়া- অনেক রকম ভাবে জড়িয়ে যাওয়া ভাঁজে ভাঁজে- আজ অনেক দিন পর ২৫শে বৈশাখ মনে পড়লো- গাড়ীতে গান বাজছে- তোমার মতোই আর আকজনকে দেখলাম বৃষ্টিতে ভিজছে উদাসীন- মনে পড়লো আজকের এ দিনটা চলে গেলে এমন ভাবে বেঁচে থাকা হয়তো হবে না --


  • ৮ টি মন্তব্য
  • ২৬৩ বার পঠিত,
Send to your 
friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ৫ জনের ভাল লেগেছে, ০ জনের ভাল লাগেনি
১. ২৮ শে জুন, ২০০৭ দুপুর ১:১৮
কৌশিক বলেছেন: সেভ করে রাখলাম, হাতে সময় নেই, লাঞ্চ করে এসে পড়বো।
২. ২৮ শে জুন, ২০০৭ বিকাল ৪:৫২
৩. ২৮ শে জুন, ২০০৭ বিকাল ৫:১৫
তেলাপোকা বলেছেন: ৫

কৌশিকের মন্তব্যটা স্টুপিডের মত মনে হচ্ছে। শালা এমন একটা লেখা না পড়ে চলে গেলো।
৪. ২৮ শে জুন, ২০০৭ বিকাল ৫:৩৮
ঝরা পাতা বলেছেন: অসাধারণ একটা লেখা। একবার পড়েছি। আরো কয়েকবার পড়বো। কেমন করে চোখ এড়িয়ে গেলো। আমিও ৫ দিলাম।
৫. ৩০ শে জুন, ২০০৭ সকাল ৯:০৯
৬. ৩০ শে জুন, ২০০৭ সকাল ১০:৩৩
স্বরহীন বলেছেন: সুমনের মন কোন দিক যায়?

মানুষ বদলায়, প্রকাশ ও বদলায়।
অনুভব বদলায় বলে কি প্রকাশ বদলায়,না একই ানুভবে ভিন্ন প্রকাশ এমনি চলে আসে...

ঠিক বুঝাইতে পারলাম না মনে হয়
৭. ৩০ শে জুন, ২০০৭ রাত ৯:০০
৮. ০১ লা জুলাই, ২০০৭ রাত ৩:০৭
সুমন চৌধুরী বলেছেন: দোস্ত যা কৈছ ফাইনাল।।...তবে কখনো কখনো মনে হয় অতীতের পাছায় লাত্থি মারা জরুরি...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন